নিকেলের পরিচিতি
নিকেল একটি রূপালী-সাদা, শক্ত, নমনীয় এবং প্রসারণশীল ধাতব মৌল। এটি ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং উচ্চ তাপমাত্রায় শক্তির জন্য পরিচিত, যা এটিকে বিভিন্ন শিল্পে মূল্যবান করে তোলে। এর রাসায়নিক প্রতীক হল Ni, এবং এর পারমাণবিক সংখ্যা ২৮।
নিকেলের দৈনন্দিন ব্যবহার
নিকেলের অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলি দৈনন্দিন জীবন এবং শিল্প প্রক্রিয়াগুলিতে এর বিস্তৃত প্রয়োগে অবদান রাখে।
১. স্টেইনলেস স্টিল উৎপাদন
নিকেল স্টেইনলেস স্টিল উৎপাদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকর ধাতু উপাদান, সাধারণত অস্টেনিটিক স্টেইনলেস স্টিলের (যেমন, ৩০৪ গ্রেড) ৮-১০% তৈরি করে। এর সংযুক্তি ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতা, নমনীয়তা এবং শক্তিকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। ভারতের অসংখ্য গৃহস্থালীর সামগ্রীতে এর প্রমাণ দেখা যায়, যার মধ্যে রয়েছে রান্নাঘরের বাসনপত্র, রান্নার সরঞ্জাম, সিঙ্ক এবং স্থাপত্যের সরঞ্জাম, যা তাদের স্থায়িত্ব এবং স্বাস্থ্যবিধির জন্য অত্যন্ত প্রশংসিত।
২. ইলেক্ট্রোপ্লেটিং এবং আবরণ
এর উজ্জ্বল, আকর্ষণীয় ফিনিশ এবং ক্ষয় প্রতিরোধের কারণে, নিকেল ইলেক্ট্রোপ্লেটিংয়ে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। একটি প্রতিরক্ষামূলক এবং আলংকারিক আবরণ প্রদানের জন্য অন্যান্য ধাতুর উপর নিকেলের পাতলা স্তর জমা করা হয়। ভারতে এই প্রয়োগটি বাথরুমের সরঞ্জাম, অটোমোবাইলের যন্ত্রাংশ এবং সাইকেলের উপাদানের মতো জিনিসগুলির জন্য সাধারণ, যা তাদের চেহারা উন্নত করে এবং তাদের আয়ুষ্কাল বাড়ায়।
৩. ব্যাটারি
বিভিন্ন ধরণের রিচার্জেবল ব্যাটারিতে নিকেল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিকেল-ক্যাডমিয়াম (Ni-Cd) এবং নিকেল-মেটাল হাইড্রাইড (Ni-MH) ব্যাটারি পোর্টেবল ইলেকট্রনিক ডিভাইসে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হত। সম্প্রতি, নিকেল-সমৃদ্ধ ক্যাথোড উন্নত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা স্মার্টফোন, ল্যাপটপ এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনকে শক্তি যোগায়, যা ভারতে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৪. মুদ্রা
নিকেল ধারণকারী সংকর ধাতুগুলি তাদের স্থায়িত্ব, পরিধান প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং জাল প্রতিরোধক বৈশিষ্ট্যের কারণে মুদ্রা তৈরিতে প্রায়শই ব্যবহৃত হয়। ঐতিহাসিকভাবে, ভারতীয় মুদ্রার বিভিন্ন মূল্যে নিকেল বা নিকেল সংকর ধাতু অন্তর্ভুক্ত ছিল, যেমন প্রাক্তন ১ টাকার মুদ্রা, যা দৈনন্দিন লেনদেনে এর ব্যবহারিক প্রমাণ দেয়।
৫. অনুঘটন
নিকেল যৌগগুলি অসংখ্য রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অনুঘটক হিসাবে কাজ করে, বিশেষ করে হাইড্রোজেনেশন প্রক্রিয়াগুলিতে। ভারতে একটি উল্লেখযোগ্য শিল্প প্রয়োগ হল বনস্পতি ঘি উৎপাদন, যেখানে নিকেল অনুঘটক ব্যবহার করে উদ্ভিজ্জ তেলকে হাইড্রোজেনেশন করা হয়, যা তরল তেলকে আধা-কঠিন চর্বিতে রূপান্তরিত করে।
প্রাকৃতিক উপস্থিতি এবং উৎস
পৃথিবীর ভূত্বকে নিকেল পঞ্চম সবচেয়ে প্রাচুর্যপূর্ণ মৌল। এটি প্রাথমিকভাবে দুই প্রকারের আকরিক জমাতে পাওয়া যায়:
সালফাইড জমা
এই জমাগুলি, যেমন পেন্টল্যান্ডাইট (Ni,Fe)$_9$S$_8$, সাধারণত মাফিক এবং আল্ট্রামাফিক ইগনিয়াস শিলায় পাওয়া হয়। প্রধান সালফাইড জমাগুলি কানাডা, রাশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থিত।
ল্যাটেরাইট জমা
এগুলি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এবং উপ-গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে আল্ট্রামাফিক শিলাগুলির তীব্র আবহাওয়ার কারণে গঠিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, গারনিয়েরাইট এবং লাইমোনাইট। ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এবং নিউ ক্যালিডোনিয়ার মতো দেশগুলিতে উল্লেখযোগ্য ল্যাটেরাইট নিকেল মজুদ রয়েছে।
ভারতে, পরিচিত নিকেলের মজুদ তুলনামূলকভাবে ছোট এবং বিক্ষিপ্ত, প্রধানত ওড়িশা (সুকিন্দা উপত্যকা), ঝাড়খণ্ড এবং নাগাল্যান্ডে পাওয়া যায়। তবে, এগুলি মূলত নিম্ন-মানের ল্যাটেরিটিক আকরিক, এবং ভারত বর্তমানে তার শিল্প প্রয়োজনের জন্য আমদানিকৃত নিকেলের উপর heavily নির্ভর করে।
শিল্প নিষ্কাশন এবং প্রক্রিয়াকরণ
নিকেলের নিষ্কাশন পদ্ধতি মূলত আকরিকের প্রকারের উপর নির্ভর করে:
সালফাইড আকরিক থেকে
সালফাইড আকরিকগুলি সাধারণত পাইরোমেটালার্জিক্যাল পদ্ধতির মাধ্যমে প্রক্রিয়া করা হয়। আকরিক চূর্ণ, গুঁড়ো করা হয় এবং ফ্লোটেশনের মাধ্যমে ঘনীভূত করা হয়। এরপর ঘনীকৃত পদার্থটি রোস্টিং এবং বৈদ্যুতিক চুল্লিতে গলানোর মাধ্যমে একটি নিকেল-আয়রন ম্যাট তৈরি করে। এই ম্যাটকে আরও শোধন করা হয় রূপান্তর এবং তারপর ইলেক্ট্রোলাইটিক রিফাইনিং বা কার্বনিলিকরণ (মন্ড প্রক্রিয়া) এর মতো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উচ্চ-বিশুদ্ধ নিকেল তৈরি করতে।
ল্যাটেরাইট আকরিক থেকে
ল্যাটেরাইট আকরিকগুলি সাধারণত হাইড্রোমেটালার্জিক্যাল বা পাইরোমেটালার্জিক্যাল রুট ব্যবহার করে প্রক্রিয়া করা হয়। হাইড্রোমেটালার্জিক্যাল পদ্ধতিতে প্রায়শই উচ্চ-চাপ অ্যাসিড লিচিং (HPAL) বা বায়ুমণ্ডলীয় অ্যাসিড লিচিং জড়িত থাকে, তারপরে সলভেন্ট এক্সট্রাকশন এবং ইলেক্ট্রোউইনিং দ্বারা নিকেল ক্যাথোড তৈরি করা হয়। ল্যাটেরাইটের পাইরোমেটালার্জিক্যাল প্রক্রিয়াকরণে স্টেইনলেস স্টিল উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত ফেরোনিকেল, একটি আয়রন এবং নিকেলের সংকর ধাতু তৈরি করতে রোটারি কিলন ইলেকট্রিক ফার্নেস (RKEF) প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।
যদিও ভারতে কিছু নিকেল সম্পদ রয়েছে, দেশটির অভ্যন্তরীণ উৎপাদন নগণ্য। ভারতীয় শিল্পগুলিতে স্টেইনলেস স্টিল, ব্যাটারি উৎপাদন এবং ইলেক্ট্রোপ্লেটিংয়ের জন্য ব্যবহৃত বেশিরভাগ নিকেল পরিশোধিত ধাতু বা ফেরোনিকেল হিসাবে আমদানি করা হয়। ভারতের দেশীয় নিম্ন-মানের ল্যাটেরিটিক মজুদ থেকে অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর নিষ্কাশন প্রক্রিয়া বিকাশের প্রচেষ্টা চলছে।