দস্তা পরিচিতি
দস্তা (Zinc) একটি রাসায়নিক উপাদান যা Zn প্রতীক দ্বারা উপস্থাপিত হয় এবং এর পারমাণবিক সংখ্যা ৩০। এটি একটি নীলচে-সাদা, উজ্জ্বল ধাতু যা সাধারণ তাপমাত্রায় ভঙ্গুর হলেও ১০০°C থেকে ১৫০°C তাপমাত্রায় নমনীয় হয়ে ওঠে। দস্তা সংক্রমণ ধাতু গোষ্ঠীর (transition metals group) সদস্য, যদিও এর রসায়ন প্রায়শই পোস্ট-ট্রানজিশন ধাতুগুলির (post-transition metals) সাথে তুলনা করা হয় কারণ এর d-শেল পূর্ণ থাকে। এটি মানব স্বাস্থ্যের জন্য একটি অপরিহার্য ট্রেস উপাদান, যা বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দস্তার দৈনন্দিন ব্যবহার
দস্তার অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলি এটিকে অসংখ্য দৈনন্দিন পণ্য এবং শিল্প প্রক্রিয়ায় অপরিহার্য করে তোলে।
১. গ্যালভানাইজেশন
দস্তার সবচেয়ে ব্যাপক ব্যবহারগুলির মধ্যে একটি হল গ্যালভানাইজেশন, যেখানে মরিচা পড়া প্রতিরোধের জন্য ইস্পাত বা লোহার উপর একটি সুরক্ষামূলক দস্তা আবরণ প্রয়োগ করা হয়। দস্তা একটি উৎসর্গীকৃত অ্যানোড (sacrificial anode) হিসাবে কাজ করে, লোহার পরিবর্তে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, ফলে অন্তর্নিহিত ধাতুকে রক্ষা করে। এই পদ্ধতি ধাতব কাঠামোর আয়ুষ্কাল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়। ভারতে, গ্যালভানাইজড ইস্পাত সাধারণত ছাদের চাদর, জলের পাইপ, বেড়া এবং নির্মাণে কাঠামোগত উপাদান হিসাবে ব্যবহৃত হয়, বিশেষ করে উচ্চ আর্দ্রতা এবং বৃষ্টিপাত প্রবণ এলাকায়।
২. ব্যাটারি
দস্তা বিভিন্ন ধরণের ব্যাটারিতে, বিশেষ করে ড্রাই সেল ব্যাটারি (যেমন: AA, AAA, C, D ব্যাটারি) এবং দস্তা-বায়ু ব্যাটারিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ড্রাই সেল ব্যাটারিতে, দস্তা অ্যানোড হিসাবে কাজ করে, যেখানে এটি ইলেকট্রন মুক্ত করার জন্য জারণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়, যা বৈদ্যুতিক শক্তি সরবরাহ করে। এই ব্যাটারিগুলি ভারতের পরিবারগুলিতে ফ্ল্যাশলাইট, রিমোট কন্ট্রোল এবং পোর্টেবল ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
৩. ঔষধি ও টপিকাল ব্যবহার
দস্তা মানুষের জন্য একটি অপরিহার্য মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, ক্ষত নিরাময়, ডিএনএ সংশ্লেষণ এবং কোষ বিভাজনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দস্তার পরিপূরকগুলি (supplements) দস্তার অভাব, ডায়রিয়া এবং সাধারণ সর্দি-কাশির চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। জিঙ্ক অক্সাইড, দস্তার একটি যৌগ, টপিকাল ক্রিম এবং মলমগুলিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এটি একটি অ্যান্টিসেপটিক, অ্যাস্ট্রিনজেন্ট এবং প্রতিরক্ষামূলক এজেন্ট হিসাবে কাজ করে, যা সাধারণত ডায়াপার র্যাশ ক্রিম, ক্যালামাইন লোশন এবং সানস্ক্রিনগুলিতে ত্বকে UV বিকিরণ থেকে রক্ষা করতে পাওয়া যায়।
৪. সংকর ধাতু
দস্তা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংকর ধাতুর একটি মূল উপাদান, যা দুই বা ততোধিক ধাতব উপাদান একত্রিত করে গঠিত উপকরণ। পিতল (Brass), তামা এবং দস্তার একটি সংকর ধাতু, এর শক্তি, ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং নান্দনিক আবেদনের জন্য সুপরিচিত। ভারতে, পিতল ঐতিহ্যগতভাবে বাসনপত্র, সজ্জার জিনিস, বাদ্যযন্ত্র এবং হার্ডওয়্যার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। দস্তা ব্রোঞ্জ এবং নিকেল সিলভার সংকর ধাতুতেও অল্প পরিমাণে ব্যবহৃত হয়।
৫. রঞ্জক ও আবরণ
জিঙ্ক অক্সাইড পেইন্ট, সিরামিক এবং রাবারে সাদা রঞ্জক হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এর অস্বচ্ছতা এবং UV আলো শোষণ করার ক্ষমতা এটিকে এই অ্যাপ্লিকেশনগুলিতে মূল্যবান করে তোলে। জিঙ্ক ক্রোমেট এবং জিঙ্ক ফসফেট ধাতুর প্রাইমারগুলিতে ক্ষয়-বিরোধী রঞ্জক হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও, দস্তা ধুলো প্রতিরক্ষামূলক আবরণ এবং রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় একটি বিজারক (reducing agent) হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
দস্তার প্রাকৃতিক উৎস
দস্তা প্রকৃতিতে মুক্ত ধাতু হিসাবে পাওয়া যায় না তবে বিভিন্ন খনিজ পদার্থের মধ্যে থাকে। দস্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আকরিক হল স্ফ্যালারাইট, যা জিঙ্ক ব্লেন্ড (ZnS) নামেও পরিচিত, এটি একটি দস্তা সালফাইড খনিজ। অন্যান্য দস্তা-ধারণকারী খনিজগুলির মধ্যে রয়েছে স্মিথসোনাইট (দস্তা কার্বনেট, ZnCO₃) এবং হেমিমরফাইট (দস্তা সিলিকেট, Zn₄Si₂O₇(OH)₂·H₂O)।
বিশ্বব্যাপী, দস্তার আকরিকের উল্লেখযোগ্য মজুত অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাওয়া যায়। ভারতে, দস্তার উল্লেখযোগ্য মজুত প্রধানত রাজস্থান রাজ্যে অবস্থিত। প্রধান খনি অঞ্চলগুলির মধ্যে রয়েছে জাওয়ার, রামপুরা আগুচা এবং রাজপুরা দারীবা, যেখানে দস্তা প্রায়শই সীসা এবং রূপার আকরিকের সাথে সহাবস্থান করতে দেখা যায়। এই মজুতগুলি আরাবল্লী পর্বতশ্রেণীর ভূতাত্ত্বিক গঠনের অংশ।
নিষ্কাশন ও শিল্প প্রক্রিয়াকরণ
এর আকরিক থেকে দস্তা নিষ্কাশন জটিল ধাতুবিদ্যা প্রক্রিয়ার একটি ধারাবাহিকতা জড়িত।
খনি এবং আকরিক বেনিফিসিয়েশন
দস্তার আকরিক সাধারণত ভূগর্ভস্থ বা ওপেন-পিট খনি পদ্ধতি ব্যবহার করে নিষ্কাশন করা হয়। একবার খনন করা হলে, আকরিক বেনিফিসিয়েশন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়, যা মূল্যবান খনিজগুলিকে গ্যাং (বর্জ্য শিলা) থেকে আলাদা করার একটি প্রক্রিয়া। এর মধ্যে সাধারণত ক্রাশিং, গ্রাইন্ডিং এবং ফ্রোথ ফ্লোটেশন জড়িত থাকে। ফ্রোথ ফ্লোটেশনে, সূক্ষ্মভাবে গুঁড়ো করা আকরিক জল এবং বিকারকগুলির সাথে মিশ্রিত হয়, এবং একটি ফ্রোথ তৈরি করার জন্য এর মধ্য দিয়ে বাতাস প্রবেশ করানো হয়। দস্তা সালফাইড কণাগুলি নির্বাচিতভাবে বাতাসের বুদবুদগুলির সাথে সংযুক্ত হয় এবং পৃষ্ঠে ভেসে ওঠে, একটি ঘনীভূত পদার্থ তৈরি করে, যখন বর্জ্য পদার্থ ডুবে যায়।
ধাতুবিদ্যাগত নিষ্কাশন
দস্তার ঘনীভূত পদার্থ, প্রধানত দস্তা সালফাইড, তারপর ধাতু নিষ্কাশনের জন্য প্রক্রিয়াজাত করা হয়। দুটি প্রধান পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়:
১. পাইরোমেটালার্জিক্যাল প্রক্রিয়া (ইম্পেরিয়াল স্মেল্টিং প্রক্রিয়া): এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে বাতাসে দস্তা সালফাইড ঘনীভূত পদার্থকে ভস্মীকরণ করে এটিকে জিঙ্ক অক্সাইড (ZnO) এবং সালফার ডাই অক্সাইডে (SO₂) রূপান্তরিত করা হয়।
2ZnS(s) + 3O₂(g) → 2ZnO(s) + 2SO₂(g)
জিঙ্ক অক্সাইডকে তারপর কার্বন (কোক) এর সাথে মিশ্রিত করে উচ্চ তাপমাত্রায় (প্রায় ১২০০°C) একটি বিজারণ চুল্লিতে উত্তপ্ত করা হয়। কার্বন একটি বিজারক হিসাবে কাজ করে, জিঙ্ক অক্সাইডকে ধাতব দস্তা বাষ্পে রূপান্তরিত করে।
ZnO(s) + C(s) → Zn(g) + CO(g)
দস্তা বাষ্পকে তারপর তরল দস্তায় ঘনীভূত করা হয়।
২. হাইড্রোমেটালার্জিক্যাল প্রক্রিয়া (ইলেকট্রোলাইটিক প্রক্রিয়া): এটি আরও সাধারণ এবং পরিবেশগতভাবে পছন্দসই পদ্ধতি। দস্তা সালফাইড ঘনীভূত পদার্থকে প্রথমে ভস্মীকরণ করে জিঙ্ক অক্সাইড তৈরি করা হয়। জিঙ্ক অক্সাইডকে তারপর পাতলা সালফিউরিক অ্যাসিড দিয়ে লিচিং করা হয় যাতে দস্তা সালফেটের একটি জলীয় দ্রবণ তৈরি হয়।
ZnO(s) + H₂SO₄(aq) → ZnSO₄(aq) + H₂O(l)
দস্তা সালফেটের দ্রবণকে লোহা, ক্যাডমিয়াম এবং তামার মতো অপদ্রব্য অপসারণের জন্য বিশুদ্ধ করা হয়। অবশেষে, বিশুদ্ধ দস্তা ধাতু ইলেকট্রোলাইসিস দ্বারা পুনরুদ্ধার করা হয়, যেখানে দস্তা সালফেটের দ্রবণের মধ্য দিয়ে সীসা অ্যানোড এবং অ্যালুমিনিয়াম ক্যাথোড ব্যবহার করে একটি বৈদ্যুতিক প্রবাহ চালিত করা হয়। দ্রবণের দস্তা আয়নগুলি ক্যাথোডের দিকে স্থানান্তরিত হয় এবং বিশুদ্ধ ধাতব দস্তা হিসাবে জমা হয়।
Zn²⁺(aq) + 2e⁻ → Zn(s) (ক্যাথোডে)
H₂O(l) → ½O₂(g) + 2H⁺(aq) + 2e⁻ (অ্যানোডে)
ভারতে দস্তা উৎপাদন
ভারত দস্তার একটি উল্লেখযোগ্য উৎপাদক, যা মূলত হিন্দুস্তান জিঙ্ক লিমিটেড (HZL) এর কার্যক্রমের কারণে। HZL, বেদান্ত রিসোর্সেসের একটি সহায়ক সংস্থা, বিশ্বের বৃহত্তম সমন্বিত দস্তা-সীসা উৎপাদকদের মধ্যে একটি। কোম্পানি রাজস্থানে বেশ কয়েকটি খনি এবং স্মেল্টার পরিচালনা করে, যার মধ্যে রয়েছে আকরিক নিষ্কাশনের জন্য জাওয়ার খনি, রামপুরা আগুচা খনি এবং রাজপুরা দারীবা খনি, এবং ধাতু উৎপাদনের জন্য চান্দেরিয়া, দারীবা এবং দেবরায় সমন্বিত স্মেল্টার কমপ্লেক্স। এই সুবিধাগুলি দস্তা নিষ্কাশনের জন্য পাইরোমেটালার্জিক্যাল এবং হাইড্রোমেটালার্জিক্যাল উভয় পদ্ধতিই ব্যবহার করে, যা ভারতের শিল্প ধাতু সরবরাহে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।