নাইট্রোজেন পরিচিতি
নাইট্রোজেন হল N প্রতীক এবং পারমাণবিক সংখ্যা 7 সহ একটি রাসায়নিক মৌল। এটি একটি অধাতু এবং পর্যায় সারণীর 15 নং গ্রুপের (যাকে প্রায়শই পিক্টোজেন বলা হয়) সবচেয়ে হালকা সদস্য। প্রমাণ তাপমাত্রা ও চাপে, মৌলটির দুটি পরমাণু একত্রিত হয়ে ডাইনাইট্রোজেন (N₂) গঠন করে, যা একটি বর্ণহীন এবং গন্ধহীন দ্বি-পারমাণবিক গ্যাস। ডাইনাইট্রোজেন স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বেশিরভাগই নিষ্ক্রিয় থাকে, এই বৈশিষ্ট্যটি এর পরমাণুগুলির মধ্যে শক্তিশালী ত্রিবন্ধনের কারণে হয়।
নাইট্রোজেনের প্রাকৃতিক উপস্থিতি
নাইট্রোজেন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রচুর পরিমাণে প্রাপ্ত মৌলগুলির মধ্যে একটি। এর প্রধান প্রাকৃতিক উৎস হল পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, যেখানে এটি আয়তন অনুসারে প্রায় 78% ডাইনাইট্রোজেন গ্যাস (N₂) হিসাবে থাকে। বায়ুমণ্ডল ছাড়িয়ে, নাইট্রোজেন সমস্ত জীবন্ত প্রাণীর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি অ্যামিনো অ্যাসিড, প্রোটিন এবং নিউক্লিক অ্যাসিড (DNA এবং RNA) এর মতো জৈব অণুতে পাওয়া যায়, যা জীবনের জন্য অপরিহার্য। পৃথিবীর ভূত্বকে, নাইট্রোজেন খনিজ জমাতে উপস্থিত থাকে, যদিও কম পরিমাণে, প্রধানত মাটি এবং নির্দিষ্ট কিছু শিলায় নাইট্রেট ও নাইট্রাইট হিসাবে। নাইট্রোজেন চক্র বায়ুমণ্ডল, স্থলজ এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে নাইট্রোজেনের অবিচ্ছিন্ন গতিবিধিকে বিভিন্ন জৈবিক ও ভৌত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বর্ণনা করে।
নাইট্রোজেনের শিল্প নিষ্কাশন
শিল্পগতভাবে, নাইট্রোজেন গ্যাস মূলত তরল বায়ুর আংশিক পাতন (fractional distillation) নামক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাতাস থেকে প্রাপ্ত হয়। বাতাসকে প্রথমে খুব কম তাপমাত্রায় ঠান্ডা করা হয় যতক্ষণ না এটি তরল হয়। যেহেতু নাইট্রোজেন, অক্সিজেন এবং আর্গনের স্ফুটনাঙ্ক ভিন্ন (নাইট্রোজেনের জন্য -196°C, অক্সিজেনের জন্য -183°C, আর্গনের জন্য -186°C), তাই তরল বাতাসকে সাবধানে গরম করে তাদের আলাদা করা যায়, যার ফলে প্রতিটি উপাদান তার নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় বাষ্পীভূত হয়। নাইট্রোজেন, যার স্ফুটনাঙ্ক সবচেয়ে কম, প্রথমে বাষ্পীভূত হয় এবং সংগ্রহ করা হয়। এই পদ্ধতিতে উচ্চ-বিশুদ্ধ নাইট্রোজেন উৎপন্ন হয়।
অন্য একটি পদ্ধতি, যা বৃহৎ-মাপের উৎপাদনের জন্য কম প্রচলিত কিন্তু অল্প পরিমাণে বা নির্দিষ্ট বিশুদ্ধতার জন্য ব্যবহৃত হয়, সেটি হল প্রেসার সুইং অ্যাডসর্পশন (PSA) বা মেমব্রেন সেপারেশন। ভারতে, অসংখ্য শিল্প গ্যাস প্ল্যান্ট বিভিন্ন সেক্টর যেমন ইস্পাত, রাসায়নিক এবং ইলেকট্রনিক্স শিল্পের জন্য নাইট্রোজেন, অক্সিজেন এবং আর্গন উৎপাদনে বায়ু পৃথকীকরণ ইউনিট (air separation units) ব্যবহার করে।
নাইট্রোজেনের দৈনন্দিন ব্যবহার
1. খাদ্য সংরক্ষণ
নাইট্রোজেন গ্যাস খাদ্যদ্রব্যের জন্য পরিবর্তিত বায়ুমণ্ডলীয় প্যাকেজিং (Modified Atmosphere Packaging - MAP)-এ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। আলু চিপস, নামকিন বা ভারতীয় বাজারে প্রচলিত অন্যান্য স্ন্যাকস আইটেমগুলির মতো খাদ্য প্যাকেজগুলিতে নাইট্রোজেন প্রবেশ করিয়ে অক্সিজেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস বা নির্মূল করা হয়। এই নিষ্ক্রিয় বায়ুমণ্ডল জারণ রোধ করে, যা পচন এবং নষ্ট হওয়ার কারণ, যার ফলে পচনশীল খাদ্যের শেলফ লাইফ বাড়ে এবং তাদের সতেজতা ও মচমচে ভাব বজায় থাকে।
2. সার উৎপাদন
নাইট্রোজেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প অ্যাপ্লিকেশনগুলির মধ্যে একটি হল সার উৎপাদন, বিশেষ করে অ্যামোনিয়া (NH₃)। হ্যাবার-বশ প্রক্রিয়া উচ্চ তাপমাত্রা এবং চাপে বায়ুমণ্ডলীয় নাইট্রোজেনকে হাইড্রোজেনের সাথে একত্রিত করে অ্যামোনিয়া সংশ্লেষিত করে। অ্যামোনিয়া পরবর্তীতে ইউরিয়া, অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট এবং ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট (DAP) উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়, যা অত্যাবশ্যকীয় নাইট্রোজেনঘটিত সার। ভারতের কৃষি খাত চাল, গম এবং আখ-এর মতো প্রধান ফসল চাষের জন্য এই সারগুলির উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, যা দেশটিকে বিশ্বব্যাপী নাইট্রোজেন-ভিত্তিক সারের বৃহত্তম উৎপাদক এবং ভোক্তাগুলির মধ্যে একটি করে তুলেছে। IFFCO এবং ন্যাশনাল ফার্টিলাইজারস লিমিটেড (NFL)-এর মতো সংস্থাগুলি ভারতে এই ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে।
3. ক্রায়োজেনিক্স এবং রেফ্রিজারেশন
তরল নাইট্রোজেন, যার স্ফুটনাঙ্ক অত্যন্ত কম (-196°C), একটি চমৎকার ক্রায়োজেনিক এজেন্ট। এটি ভারতের মেডিকেল গবেষণা, হাসপাতাল এবং IVF (ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) কেন্দ্রগুলিতে রক্ত, টিস্যু এবং জেনেটিক উপাদানের মতো জৈবিক নমুনাগুলির দ্রুত হিমায়িতকরণ এবং সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়। এটি পশুপালনের শুক্রাণু এবং ভ্রূণের ক্রায়োপ্রিজারভেশনের জন্যও ব্যবহৃত হয়। খাদ্য শিল্পে, তরল নাইট্রোজেন খাদ্যদ্রব্য ফ্ল্যাশ-হিমায়িত করার জন্য ব্যবহৃত হয়, যা তাদের গঠন এবং পুষ্টির মান বজায় রাখতে সহায়তা করে।
4. নিষ্ক্রিয় বায়ুমণ্ডল তৈরি করা
নাইট্রোজেনের নিষ্ক্রিয় প্রকৃতি এটিকে বিভিন্ন শিল্প প্রক্রিয়ায় অক্সিজেন-মুক্ত বা নিষ্ক্রিয় বায়ুমণ্ডল তৈরির জন্য অমূল্য করে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের তেল শোধনাগার এবং রাসায়নিক প্ল্যান্টগুলিতে বিস্ফোরণ বা অবাঞ্ছিত বিক্রিয়া প্রতিরোধের জন্য পাইপলাইন, ট্যাঙ্ক এবং রাসায়নিক রিয়্যাক্টর পরিষ্কার করতে এটি ব্যবহৃত হয়। ইলেকট্রনিক্স শিল্পে, সংবেদনশীল উপাদানগুলির জারণ রোধ করতে সেমিকন্ডাক্টর তৈরির সময় নাইট্রোজেন কম্বল ব্যবহার করা হয়। এটি ইনক্যানডিসেন্ট লাইট বাল্বগুলিতে ফিলামেন্টকে অকালে পুড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য একটি ফিলার গ্যাস হিসাবেও ব্যবহৃত হয়।
5. টায়ার স্ফীতি
নাইট্রোজেন গ্যাস ক্রমবর্ধমানভাবে বিশেষায়িত যানবাহন, যেমন বিমান, রেসিং কার এবং ভারী শিল্প যানবাহনগুলির টায়ার ফুলানোর জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। সংকুচিত বাতাসের তুলনায়, নাইট্রোজেন আরও স্থিতিশীল টায়ার চাপ প্রদান করে কারণ এটি তাপমাত্রা-প্ররোচিত চাপের ওঠানামার প্রতি কম সংবেদনশীল। এর বৃহত্তর অণুর আকার মানে এটি রাবারের মধ্য দিয়ে আরও ধীরে ধীরে প্রবেশ করে, সময়ের সাথে সাথে চাপ হ্রাস কমায়। উপরন্তু, নাইট্রোজেনে আর্দ্রতার অনুপস্থিতি চাকার রিম এবং ভালভ স্টেমের অভ্যন্তরীণ ক্ষয় রোধ করতে সাহায্য করে, যদিও এই অ্যাপ্লিকেশনটি ভারতের সাধারণ যাত্রীবাহী যানবাহনে কম প্রচলিত।